নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় জেলাজুড়ে তীব্র নিরাপত্তা-উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় কারাগার ভেঙে ৮৫টি অস্ত্র ও প্রায় ৮ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ লুট করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার এবং বেশিরভাগ কয়েদিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এখনও ২৭টি অস্ত্র এবং ৬ হাজারের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি। একই সঙ্গে ১৬৬ জন কয়েদি এখনও পলাতক রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, উদ্ধার না হওয়া এসব মারাত্মক অস্ত্র ও গোলাবারুদ জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে নরসিংদী সদরের আলোকবালি এবং রায়পুরার নীলক্ষায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বন্দুকযুদ্ধ ও খুনের ঘটনার পেছনে এই লুট হওয়া অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা ও সংশ্লিষ্টরা।
নরসিংদী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওভারঅল নরসিংদী জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তলানিতে নিয়ে গেছে। আমরা মনে করি যেসব সন্ত্রাসী এবং অপরাধীদের হাতে এ অস্ত্রগুলো আছে, অবিলম্বে তা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক।’ নরসিংদী জজ কোর্টের আইনজীবী মুনসুর আলি শিকদার জানান, কিছু আসামি আদালতে এসে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলেও যারা এখনও পলাতক রয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবেই এই অস্ত্র লুটের সঙ্গে জড়িত। আদালতের আরেকজন আইনজীবী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো দিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা নরসিংদীবাসীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা নরসিংদী জেলা কারাগারের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। সে সময় কারাগারের ব্যারাকে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের পাশাপাশি ৮২৬ জন কয়েদির সবাই পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে একই বছর কারাগারটি সংস্কার করে পুনরায় বন্দি রাখার উপযোগী করা হয়। তবে সেদিনের অগ্নিসংযোগে কারাগারের অফিসসহ সমস্ত নথি, রেকর্ডপত্র ও কম্পিউটার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখনও দাপ্তরিক কাজে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. তারেক কামাল। তিনি বলেন, ‘এই অগ্নিসংযোগে তো আসলে গোটা কারাগারই অগ্নিতপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং অফিস পুরাটাই পুড়ে গিয়েছিল এবং ওই সময় যত নথি-রেকর্ডপত্র কম্পিউটার ছিল সবই ধ্বংস হয়ে গেছে; যার কারণে আমরা প্রতিনিয়তই দাপ্তরিক কাজে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি এই সমস্যা থেকে ওভারকাম করার জন্য।’
এদিকে অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আশিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, ‘আমরা প্রতিদিন অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করছি। অস্ত্র উদ্ধারের ফলে চরাঞ্চল এখন শান্ত। অস্ত্রগুলো উদ্ধারের জন্য অভিযান তৎপরতা অব্যাহত আছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত, জুলাই আন্দোলন চলাকালে নরসিংদী জেলায় ২০ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের তালিকায় ৪৪৩ জন আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে, যদিও বেসরকারি হিসাবে আহতদের সংখ্যা সহস্রাধিক।