জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার গতকাল মঙ্গলবার বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে বৃদ্ধি করেছে। একই সঙ্গে লঞ্চমালিকেরা কিলোমিটারে ১৭ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাকচালকেরাও বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে পাঁচ মাস পর আবারও ভাড়া ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়ছে মানুষ। যাত্রীবাহী যানবাহনের বাড়তি ভাড়া সরাসরি জনগণের পকেট থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের বাড়তি ব্যয়ের চাপ প্রথমে ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা বহন করলেও শেষ পর্যন্ত তা নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ছে।
গত রোববার রাতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এর আগে পাঁচ মাস আগে গত এপ্রিলে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, তখন বাসভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বেড়েছিল। পাঁচ মাসে দুই দফায় ডিজেলের মূল্য বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে, কারণ বাস, ট্রেন, লঞ্চ, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও জাহাজসহ প্রায় সব যানবাহনই ডিজেলে চলে। এছাড়া কৃষিযন্ত্রের বড় অংশও ডিজেল দিয়ে চালানো হয়।
সচিবালয়ে ভাড়া বৃদ্ধি–সংক্রান্ত বৈঠক শেষে গতকাল সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, যেকোনো ভাড়া বৃদ্ধিই জনগণের জন্য চাপ। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভাড়া যা বেড়েছে, তা যৌক্তিকের চেয়েও কম রাখতে সরকার সক্ষম হয়েছে।
নতুন সরকারি ভাড়ার তালিকা কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন পথে বেশি টাকা নেওয়ার চিত্র দেখা গেছে। গতকাল ঢাকার সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিতে দেখা যায়। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে গতকাল সকালে হোসনে আরা বেগম নামের এক যাত্রী তার মেয়ের সঙ্গে গোপালগঞ্জ যাওয়ার জন্য সাধারণ বাসের দুটি টিকিট ১ হাজার ১০০ টাকায় কেটেছিলেন। তিনি জানান, কোনো বাসেই কম ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না, সবাই টিকিটে ৫০ টাকা করে বাড়তি নিচ্ছে। এছাড়া রাজধানী ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে বাসে কোথাও ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা বা ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাইড শেয়ারিং বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালকেরাও দূরত্বভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।
সরকারি নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা হয়েছে। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। তবে সরকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া এবং ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী অন্য যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় না।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও ইচ্ছেমতো ভাড়া বেড়েছে। পাবনা থেকে পেঁয়াজ নিয়ে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে আসা ট্রাকচালক মোহাম্মদ মাসুদ জানান, তার ট্রাকে যাওয়া-আসায় প্রায় ২২০ লিটার ডিজেল লাগে। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় একই যাত্রায় শুধু ডিজেলের পেছনে তার খরচ বাড়বে ৪ হাজার ৪০০ টাকা। বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও সাভার পর্যন্ত ট্রাকে এখন পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বেনাপোল থেকে সাড়ে ১০ টনের কাভার্ড ভ্যানে গার্মেন্টস পণ্য ঢাকার কাঁচপুরে নিতে আগে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন নেওয়া হচ্ছে ২২ হাজার টাকা। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পাঠানোর ভাড়াও ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে ৫০ হাজার টাকার ভাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে বলে জানিয়েছেন পণ্য পরিবহন মালিকদের সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসাইন।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানির কনটেইনার ব্যবস্থাপনাতেও। চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর বিভিন্ন সেবার ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘জ্বালানি সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে, যা সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
লঞ্চের ভাড়াও বেড়েছে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি না করলেও লঞ্চ মালিক সমিতির নির্ধারিত নতুন ভাড়া গতকাল মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ঢাকা-বরিশাল নৌপথে সরাসরি চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চে ডেকের ভাড়া ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে।
দেশে গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২২ সাল থেকেই মূল্যস্ফীতির হার চড়া এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ বলে জানানো হয়, যা ২০২২ সালে সরকারি হিসাবে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং দারিদ্র্য বাড়বে। বেসরকারি চাকরিজীবী সালাউদ্দিন সরদার বলেন, সরকার বলছে উপায় না পেয়ে দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পিঠ তো অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে আছে।
লঞ্চমালিকেরা কিলোমিটারে ১৭-২০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন।