রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। ঘটনার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে ছিলেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরবের বার্তা দিয়ে দেশে ফিরেই তাঁকে দলের কিছু নেতা-কর্মীর সামাজিক অপরাধের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যার মধ্যে রাড্ডার ঘটনাটি অন্যতম। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শক্ত অবস্থান নিয়েছেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। বুধবার রাতেই এই নির্দেশ পাওয়ার পর গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগপত্র জমা দেন। গতকালই জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
রাড্ডার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা চলে আসছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করতে পারেনি। বর্তমান বিএনপি সরকারের সাড়ে সাত মাসেও সেই অস্বস্তি কাটেনি। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একের পর এক অপরাধের ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও লুটপাটের পাশাপাশি ২৬ সেপ্টেম্বর ইসিবি এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে ভবন দখলের চেষ্টা এবং মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে প্লট দখলের মতো ঘটনাগুলো সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায় সরকারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাড্ডার ঘটনায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং নিজ দলের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর একটি স্পষ্ট বার্তা যে অপরাধ বা অনিয়মে রাজনৈতিক পরিচয় ঢাল হবে না। এই ঘটনার আগেই বুধবার রাতে বিএনপি ও যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তর এবং ছাত্রদলের মহানগর পশ্চিম কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও রাড্ডা–কাণ্ডে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাদের আরও কারও কারও সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা আছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, যারা নানা সুযোগে দলে ঢুকেছে বা যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ থেকে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, সরকার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা লজ্জাজনক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক, জুয়াসহ যেকোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদের দলীয় পরিচয় যা–ই হোক, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ সামগ্রিকভাবে অপরাধ দমনে অভিযান চলমান আছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যেখানেই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটবে, সেখানেই অ্যাকশন হবে, অপরাধীদের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সরকারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে দলের ভেতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নজরদারির জন্য সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন।