যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই দেশের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে এই হামলার সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। সম্ভাব্য এই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার এবং বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোকে নিশানা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গত বুধবার এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বরাতে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র সামরিক অভিযান পরিচালনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। চলতি সপ্তাহেই বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। কিছু মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীর ধারণা, টানা তিন দিন ধরে ইরানের ওপর ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালানো হতে পারে। এই হামলার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তেহরান শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হয়।
তবে এই যৌথ সামরিক পরিকল্পনার বিপরীতে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান। যেকোনো ধরনের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া এবং সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি। ইরানি আলোচক দলের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি মাত্র তিন দিনে যুদ্ধ শেষ করার ধারণাকে আকাশকুসুম কল্পনা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের পাল্টা হামলা হবে আরও বেশি তীব্র, সৃজনশীল এবং ভিন্ন ধাঁচের।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে বড় আকারের হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার পরিবর্তন করা। তবে প্রায় আট মাসের দীর্ঘ সংঘাত, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের পরও ইরানের বর্তমান সরকার টিকে রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো ছাড় দেয়নি। উপরন্তু আগের ওই হামলায় লক্ষ্য অর্জিত তো হয়ইনি, উল্টো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতে টান পড়ে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি বছর একাধিকবার ইরানে বড় হামলার প্রস্তাব নাকচ বা স্থগিত করেছেন। এমনকি গত অক্টোবরের শুরুতেই সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে তিনি হামলা স্থগিতের নির্দেশ দেন। তবে আগামী নভেম্বরের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনীসহ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনার প্রধান কেন্দ্রে রয়েছে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত ‘পিক্যাক্স’ কেন্দ্রসহ ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা। ট্রাম্প সেখানে ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। যদিও অস্ত্রবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাটির ওপর বিস্ফোরিত হওয়া এই বোমা ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে তেলের দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধির আশঙ্কায় কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ইরানের তেল শোধনাগারগুলোতে সরাসরি আঘাত না করার পক্ষে। তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহি জানান, সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জ্বালানির দাম বাড়ানো, কারণ এতে মার্কিন জনগণ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা চালানো হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি বিভিন্ন ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলেও আঘাত হানতে পারে তেহরান। ইতোমধ্যেই হুতিদের হামলার কারণে গত বুধবার সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে না থাকা মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন।
হামলার এই পরিকল্পনার পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসেবনিকেশও রয়েছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নেতানিয়াহু হেরে গেলে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি কিছুদিন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, যার অধীনে নতুন যুদ্ধ শুরু করা কঠিন হতে পারে। তবে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, যৌথ হামলার আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের নিয়ে নতুন করে ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেমের মতে, সেক্ষেত্রে নেতানিয়াহুকে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গভীর সন্দেহের মুখে পড়তে হবে।
বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। তেহরান চায় প্রথমে হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি চুক্তি হোক এবং পরবর্তী ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হোক, তবে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই পারমাণবিক বিষয়টিকে আলোচনার মূল টেবিলে রাখতে চায়। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল মন্তব্য করেছেন, অঞ্চলটি যখন আরও অস্থিতিশীল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে পরিস্থিতির কীভাবে উন্নতি হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।