ইসরায়েলের পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে (এক্সিট পোল) গভীর রাতে বড় ধরনের নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বিরোধী জোট এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও সর্বশেষ আপডেটে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। দেশটির দুটি প্রধান গণমাধ্যমের সংশোধিত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবির এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—উভয় পক্ষই এখন সমান ৫১টি করে আসন নিয়ে সমানে-সমান অবস্থানে রয়েছে। ফলে ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১ আসন) কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারছে না।
ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম 'কান ১১' এবং টেলিভিশন চ্যানেল 'চ্যানেল ১৩'-এর সর্বশেষ তথ্য মতে, নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের দুই শিবিরই ৫১টি করে আসন পাচ্ছে। তবে অপর প্রধান গণমাধ্যম 'চ্যানেল ১২' এখনও বিরোধী জোটকে ৫২-৫০ আসনে সামান্য এগিয়ে রেখেছে। এই জরিপের সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দলটি পূর্বের অনুমানের চেয়ে আসন বাড়িয়ে এককভাবে সর্বোচ্চ ২৭টি আসন পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে আইজেনকোটের দল 'ইয়াশার' পাচ্ছে ২১টি আসন, যা লিকুদকে পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রেখেছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি দুটি আসন বাড়িয়ে ২৭টিতে পৌঁছালেও তাদের মিত্র উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিত একটি আসন হারিয়ে ৬টিতে নেমেছে। একইভাবে বিরোধী শিবিরের বামপন্থী ডেমোক্র্যাট দল একটি আসন হারিয়ে ৯টিতে নেমে এসেছে। তবে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি অর্থাৎ আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো তাদের আগের ১৮টি আসন শক্তভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
জরিপের ফল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির প্রধান কার্যালয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীরা একে একে কার্যালয়ে পৌঁছালে কর্মীরা আনন্দ-উল্লাস করেন এবং ব্যালট পেপার বাতাসে উড়িয়ে উদযাপন করেন। কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আমিচাই চিকলি। আয়োজকেরা জানান, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শীঘ্রই কার্যালয়ে এসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। নেতানিয়াহু আগেই স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর দল এই নির্বাচনে পরাজিত হয়নি।
অন্যদিকে, ফল ঘোষণার পর নিজের দলীয় কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিরোধী জোটের নেতা ও ইয়াশার প্রধান গাদি আইজেনকোট। তিনি চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য দেশবাসীকে অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি স্পষ্ট যে জনগণ পরিবর্তন এবং নেতানিয়াহুর ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। তিনি নেতানিয়াহুকে জনগণের অনাস্থা মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভোটারদের এত বড় উপস্থিতির পর আবার নতুন নির্বাচন দেওয়া মারাত্মক ভুল হবে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে নিয়ে একটি দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। আইজেনকোট জানান, তাঁর সরকার সবার জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করবে এবং হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করতে কাজ করবে। তিনি দেশপ্রেমের জায়গা থেকে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা প্রধানদের ব্যক্তির স্বার্থ না দেখে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মিথ্যা ও ব্যর্থতার যুগ এবার শেষ হয়েছে।
দুই প্রধান জোটের ৫১-৫ ৫১ আসনের টাইয়ের কারণে ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির আসন বাড়লেও ফিলিস্তিনি-আরব দলগুলো তাঁর সম্পূর্ণ বিরোধী হওয়ায় তাঁর পক্ষে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। একইভাবে আরব দলগুলোর সরাসরি সমর্থন ছাড়া আইজেনকোটের পক্ষেও সহজে সরকার গঠন সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, দুই নেতাই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে সরকার গঠনের অনুমতি চাইবেন। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশকে আবার নতুন নির্বাচনের পথেই হাঁটতে হতে পারে।