রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা শৃঙ্খলার আওতায় আনতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া চালু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারির পর এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে নেমেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। মঙ্গলবার থেকে নগর ভবন ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে ১০০ টাকার বিনিময়ে রিকশার আবেদন ফরম বিক্রি শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) ফরম ছাপিয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পর্ষদ বৈঠকের পরেই ফরম বিক্রির তারিখ ঘোষণা করা হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শুধু আবেদন ফরম জমা দিলেই চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ মিলবে না। বাহনটির প্রয়োজনীয় কারিগরি মান ও সুরক্ষা পরীক্ষা করা হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) উদ্ভাবিত নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য ও অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা রিকশাগুলোকেই কেবল ফিটনেস সনদ দেওয়া হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর থাকতে হবে। ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্পষ্ট করেছেন যে, বুয়েটের নির্ধারিত শর্ত ও শারীরিক যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ বাহনকেই কেবল ছাড়পত্র দেওয়া হবে। আবেদন জমার পর যাবতীয় কাগজপত্র ও মান পরীক্ষা শেষে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন ইস্যু করা হবে। কোনো আবেদন নামঞ্জুর হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল করার সুযোগও রয়েছে।
নতুন বিধিমালার আওতায় একজন বাংলাদেশি নাগরিক তাঁর একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন। তবে একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়েও এই পাঁচটির সীমা অতিক্রম করা যাবে না। পাশাপাশি এক সিটি করপোরেশনের নিবন্ধিত রিকশা অন্য সিটিতে চালানো যাবে না। চালক বা মালিকের বয়স হতে হবে অন্তত ১৮ বছর এবং আদালতের দ্বারা অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত কোনো ব্যক্তি নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন না। আবেদনের সময় এনআইডির সত্যায়িত কপি, দুই কপি সত্যায়িত ছবি, ফি জমার রসিদ ও ছক অনুযায়ী ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।
নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যাত্রীধারণ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই যাত্রীবাহী ই-রিকশার জন্য নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা ও বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। আর চার যাত্রীবাহী রিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা ও বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। উভয় ক্ষেত্রে ফিটনেস সনদের ফি ১ হাজার টাকা। প্রতিটি রিকশার নিবন্ধনের মেয়াদ দেওয়া হবে ৫ বছর এবং একটি বাহনের আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। মেয়াদের শেষে পুরনো নম্বরে নতুন রিকশা নামানো গেলেও ১২ বছরের আয়ুষ্কাল পূর্ণ হলে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট চিরতরে বাতিল হয়ে যাবে। নিবন্ধিত প্রতিটি যানবাহনে কিউআর কোডযুক্ত আলাদা নম্বরপ্লেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে গঠিত ছয় সদস্যের গবেষক দল ঢাকার প্রচলিত ১২ ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশা বিশ্লেষণ করে ১৬টি বিশেষ নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যযুক্ত নতুন নকশা তৈরি করেছে। এই নকশায় হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক, পার্কিং ব্রেক, মোড় নেওয়ার সংকেতবাতি, লুকিং গ্লাস, স্থায়ী হেডলাইট, সামনের কাচ ও স্থায়ী ছাউনির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অধ্যাপক এহসান জানান, প্রায় এক ডজন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এই নকশার টাইপ অনুমোদন নিয়েছে এবং আরও ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বাজার তথ্য অনুযায়ী, বুয়েটের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি নতুন রিকশা তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এর সঙ্গে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দামের মানসম্মত ব্যাটারি যুক্ত করতে হয়। তবে পুরনো রিকশা বাতিল না করেও বুয়েটের নকশা অনুযায়ী রূপান্তর করে ফিটনেস পরীক্ষার মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে রাজধানীতে দুই ধরনের মালিকানায় ব্যাটারি রিকশা চলছে। অনেক চালক নিজেই বাহনের মালিক, ফলে দৈনিক গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জের খরচ মেটানোর পর অর্জিত পুরো আয় তাঁদের কাছেই থাকে। আবার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীর ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত রিকশা রয়েছে, যা তাঁরা নির্দিষ্ট দৈনিক ‘জমা’র ভিত্তিতে চালকদের কাছে ভাড়া দেন। বর্তমানে রিকশাভেদে প্রতিদিনের জমা দিতে হয় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। গ্যারেজ ভাড়া, চার্জের খরচ ও জমা বাদ দিয়ে একজন চালক দিনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিট আয় করেন। তবে নতুন ও দামি ই-রিকশার ক্ষেত্রে এই জমার পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঢাকাকে আটটি আলাদা অঞ্চলে ভাগ করে ই-রিকশা চলাচলের সীমানা নির্দিষ্ট করে দেবে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশ ও কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি অঞ্চলের রিকশার রং ভিন্ন হবে এবং এক অঞ্চলের রিকশা অন্য অঞ্চলে যেতে পারবে না। মূল সড়কে এসব রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে স্কুল, হাসপাতাল ও জনবহুল এলাকায় গতি ১৫ কিলোমিটারে সীমিত রাখতে হবে। মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি করিডর ও সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ কোনো সড়কে ই-রিকশা চলাচল সম্পূর্ণ অবৈধ। ই-রিকশা চার্জ দেওয়ার স্টেশনের জন্যও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ আলাদা নিবন্ধন লাগবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বা ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিংয়ের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে দেশে ৭০ লাখের বেশি অবৈধ তিন চাকার যানবাহন চলছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ।