সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে দিনভর পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলন চলাকালে আশুলিয়ায় একটি কাভার্ডভ্যানে ও গাজীপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ, বিজিবি সদস্য ও সংবাদকর্মীসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত এড়াতে নিরাপত্তার স্বার্থে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর অঞ্চলে ৭ শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে সাভার ও আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবে কাজে যোগ দিলেও নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ভেতরে প্রবেশ করে কর্মবিরতি শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। পরবর্তীতে তারা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
উভয়পক্ষের সংঘাতের ঘটনায় শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ, পথচারী এবং সাধারণ শ্রমিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। নাশকতার অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া সকালে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকায় শ্রমিকরা অবস্থান নিলে আশুলিয়া থানা পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিমসহ কয়েকটি কারখানার সামনে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের সরিয়ে দেয়। পাশাপাশি আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায় স্কাইলাইন কারখানার সামনেও শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানান, সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েই কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। এ ছাড়া নিউ এইজ পোশাক কারখানার দুই শ্রমিককে রোববার পুলিশ আটক করেছে এমন অভিযোগে ওই কারখানার শ্রমিকরা সোমবারও বিক্ষোভ করেছেন। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, সকালে নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে শ্রমিকরা অবস্থান নিলে পুলিশ বুঝিয়ে সরিয়ে দেয়। কারখানায় ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সোমবারের সহিংসতায় তাদের আওতাধীন ২৬৪টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনে বহিরাগত ও দুষ্কৃতকারীরা যোগ দিয়েছে বলে তথ্য রয়েছে এবং কাভার্ডভ্যানে আগুনের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে গাজীপুরে টানা চতুর্থ দিনের মতো বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিভিন্ন শিল্প কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছেন। সকাল থেকেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নলজানি, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, ভোগড়া, নাওজোর ও সাইনবোর্ড এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরে নাওজোর এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সময়ে সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার মেহেদী হাসান ও ক্যামেরাপার্সন বেপরোয়া শ্রমিকদের হামলায় আহত হন এবং তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে এক বিজিবি সদস্যসহ মোট ১০ জন আহত হন।
গাজীপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এলাকাটিতে ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভ চলাকালে লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের অবস্থান ও মিছিল করতে দেখা যায়। বিশৃঙ্খলা ঠেকাত গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে অবস্থান নেন। নিরাপত্তার কারণে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী, নাওজোর হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশের শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, জানমাল ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।