বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং এই সম্পর্কটি বর্তমানে এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সতর্কবার্তা দেয়া সত্ত্বেও নয়া দিল্লিতে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হয়, যা নিয়ে ব্যাপক শোরগোল চলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একাংশও মন্তব্য করেছে যে, ভারত সরকারের সায় না থাকলে রাজধানী নয়াদিল্লির মতো স্থানে হাসিনা এই অনুষ্ঠান করতে পারতেন না।
এই সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের অংশগ্রহণ ও তার ভিডিও বার্তার ধরন নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। আলোচনার নির্দিষ্ট সময়ে সাকিব খেলার মাঠে থাকলেও অনলাইনে যুক্ত হন এবং পরে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরে ভিডিও দেন। এই ঘটনা তার দলের প্রতি আন্তরিকতা নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিকদের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে। এদিকে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের সুযোগ দেয়ায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারতকে আগেই উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। ঢাকাই এই অনুষ্ঠানকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি অপমান হিসেবে অভিহিত করেছে।
যদিও নয়াদিল্লি জানিয়েছে যে, এই অনুষ্ঠান আয়োজনে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা বা অনুমোদন ছিল না, তবে এই ব্যাখ্যায় ঢাকার ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ব্যাপক প্রাণহানির কথা উঠে আসে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ২০২৪ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং ভারতে আশ্রয় নেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর মতে, হাসিনাকে জোর করে দেশে পাঠানো ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত নয়, তবে তার স্বেচ্ছায় ফেরা সম্পর্কের উত্তেজনা কমাতে পারে। ভারত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে ইউরোপের কিছু দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জল্পনা থাকলেও নয়াদিল্লি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীনের দিকে ঝোঁকা এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ভারতের অস্বস্তি বাড়িয়েছিল। যদিও ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ওই অঞ্চলের বিদ্রোহ মোকাবিলায় ঢাকার সহযোগিতা দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় ভারত ৪৫ হাজার টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ এবং নতুন দূত দিনেশ ত্রিবেদীকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেয়াসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়া ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা ইস্যুর সমাধান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতীয় সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিও উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে আস্থা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছে, তবে হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই সম্পর্কের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের যে রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা ২০২৬ সালের মধ্যে ৩০টি নতুন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য ছিল, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।