প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭: ৫৬ (2026)
দাম্পত্য জীবন শুরু হয় অনেক স্বপ্ন, গভীর ভালোবাসা এবং একসঙ্গে বার্ধক্যে পৌঁছানোর এক পবিত্র অঙ্গীকার নিয়ে। প্রতিটি মানুষের হৃদয়েই একটি শান্ত, নিরাপদ ও বরকতময় পরিবার গড়ে তোলার আকুলতা থাকে। ইসলামে এই রহমতপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয় বিয়ের পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে, যা মানুষকে হালালের অকৃত্রিম স্বাদ উপভোগের সুযোগ করে দেয়। তবে জীবনের পথ সবসময় মসৃণ থাকে না। কখনো তৃতীয় পক্ষের মিথ্যাচার, ভুল বোঝাবুঝি, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, অপূর্ণ প্রত্যাশা কিংবা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কষ্ট দাম্পত্যের সুন্দর বুননকে ভেতর থেকে দুর্বল ও পচনশীল করে তোলে।
ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে কেবল দুটি মানুষের একসঙ্গে বসবাস হিসেবে দেখা হয়নি। পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় বিয়ে হলো ‘মাওয়াদ্দাহ’ (পারস্পরিক ভালোবাসা), ‘রাহমাহ’ (দয়া) ও ‘সাকিনাহ’ (প্রশান্তি)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের ‘লেবাস’ বা পোশাক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা একে অন্যের ত্রুটি আড়াল করবে, মর্যাদা রক্ষা করবে এবং নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। দাম্পত্যে মতভেদ বা রাগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি কঠিন সময় বা ভুল মানেই সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; বরং আন্তরিক ক্ষমা ও আত্মসমালোচনা অনেক গাঢ় দূরত্বও মুছে দিতে পারে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য ইসলাম কখনো তালাককে প্রথম সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করেনি, বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে একজন সালিশ পুরুষ পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ নারীর পরিবার থেকে নিয়োগ করো। তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দেবেন।’ এই নির্দেশনা অনুযায়ী, নিজেদের ভুলগুলো নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করা, সম্মানজনক আলোচনা করা এবং উভয় পরিবারের জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষদের সম্পৃক্ত করা উচিত। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেম বা বৈবাহিক কাউন্সেলরের সহযোগিতা নিয়ে এবং ইস্তিখারা ও ইস্তিশারার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সব আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল ইসলাম তালাকের বৈধ পথ উন্মুক্ত রেখেছে। সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যত নির্যাতনই হোক না কেন, সংসার টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় নেকি। তবে ইসলাম কখনো জুলুমকে ইবাদত বানায়নি। যে সংসারে প্রতিদিন অপমান, গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অবিশ্বাস, চরিত্রহনন ও ব্ল্যাকমেইল চলতে থাকে, তা মূলত কোনো বৈবাহিক বন্ধন নয়, বরং একটি বিষাক্ত সম্পর্ক বা ‘Toxic Relationship’। এমন পরিস্থিতিতে বছরের পর বছর নিজেকে ধ্বংস করা কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলাম যেমন বিধবা নারীদের সম্মান করতে শেখায়, তেমনি তালাকপ্রাপ্তা আল্লাহভীরু নারীদেরও কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুমিনাহ হিসেবে সম্মানের দাবিদার মনে করে।
অনেকে তালাককে ঈমানের ব্যর্থতা মনে করলেও ইসলামের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। সাহাবিদের যুগেও তালাক ও খোলার ঘটনা ঘটেছে। যেমন, জায়েদ ইবন হারিসা (রা.) ও জয়নব বিনতে জাহশ (রা.)-এর দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘটেছিল এবং পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়নব (রা.)-কে বিয়ে করেন, যার উল্লেখ সুরা আল-আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে রয়েছে। আবার সাবিত ইবন কায়স (রা.)-এর স্ত্রী জামিলা বিনতে সালুল (কিছু বর্ণনায় হাবিবা নামেও উল্লেখ রয়েছে) স্বামীর দ্বীন বা চরিত্র নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি; কিন্তু তার সঙ্গে বৈবাহিক জীবন চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে খোলার অনুমতি দেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে—তালাক বা খুলা ইসলামে কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়; তবে তা কখনো আবেগের সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং প্রয়োজনের শেষ সমাধান ছিল।
যদি—ভুলের জন্য আন্তরিক অনুতাপ থাকে; পরিবর্তনের বাস্তব লক্ষণ দেখা যায়; পারস্পরিক সম্মান জীবিত থাকে; সন্তানদের কল্যাণে উভয়েই আন্তরিক হন; সম্পর্কের ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে থাকে—তাহলে নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করাই উত্তম। অনেক সম্পর্কই দ্বিতীয় সুযোগের মাধ্যমে আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে। কারণ তারা অহংকার (Ego) নয়, ক্ষমা ও সংশোধনকে বেছে নিয়েছে। আবার কখনো কখনো বিচ্ছেদেই কল্যাণ নিহিত থাকে—দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে; নিরাপত্তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত হয়ে যায়; বারবার বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা ঘটে; আসক্তি, সহিংসতা বা জুলুম সংশোধনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়; মিথ্যা, কুফরি এবং আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করা বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব হয়ে পড়ে—তখন শরিয়ত বিচ্ছেদের বৈধ পথ রেখেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন—‘যদি তারা পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ নিজ প্রাচুর্য দ্বারা প্রত্যেককে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন।’ (সুরা আন-নিসা : ১৩০)
দাম্পত্য জীবনের এই সংকট কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি মূলত একটি গভীর সামাজিক সংকট। একজন অভিজ্ঞ শরিয়াহ গবেষকের ভাষায়, "আজকের ক্রাইসিসের বড় চরিত্রটা আইনি নয়; এর মূল বাস্তবতা সামাজিক।" দীর্ঘদিনের অভিমান, যোগাযোগের অভাব, অহংকার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ অনেক সম্পর্ককে তালাকের দিকে ঠেলে দেয়, যা শুরুতেই সচেতনতা ও পারিবারিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই তালাক প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে ইসলাম ‘তাসরিহুন বি ইহসান’ বা উত্তম রূপে বিদায়ের শিক্ষা দিয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার ও মর্যাদা প্রাধান্য পায়। ইসলাম মানুষকে জুলুমের নিচে পিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য করে না, বরং প্রজ্ঞা ও মর্যাদার আলোকে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায়।
যদি চেষ্টার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, যদি সম্পর্কটি কেবল জুলুম, ভয়, অপমান এবং Toxicity-এর আরেকটি নাম হয়ে দাঁড়ায়, তবে মনে রাখবেন—ইসলাম আপনাকে অনন্তকাল সেই আগুনে পুড়তে বলেনি। একটি মর্যাদাপূর্ণ তালাক অনেক সময় একটি অপমানজনক সম্পর্কের চেয়ে উত্তম। আর আল্লাহর হারামকৃত আত্মহত্যা বা হত্যার চেয়ে শরিয়তসম্মত বিচ্ছেদ নিঃসন্দেহে অসীম কল্যাণকর পথ। কখনো ধৈর্য ও ক্ষমাই একটি সংসারকে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়। আবার কখনো মর্যাদাপূর্ণ বিদায় একজন মুমিনের ঈমান, জীবন ও সম্মান রক্ষা করে। ইসলাম মানুষকে জুলুমের নিচে পিষ্ট হয়েও বেঁচে থাকতে বাধ্য করে না; বরং ন্যায়, প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোকে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায়।