প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও, বারবার ‘শেখ হাসিনা’ ইস্যুতে এসে তাদের হিসাবনিকাশ আটকে যাচ্ছে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশটির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, তিনি আর কোনো রাজনৈতিক বা উসকানিমূলক বক্তব্য দেবেন না। কিন্তু এরপরও আস্থার সংকট কাটেনি। ঢাকায় সংশয় রয়ে গেছে যে, ভারত হাসিনাকে ব্যবহার করে নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে কি না। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া এবং ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণের চিঠিতে তারেক রহমানকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন না করায় এই সংশয় আরও গভীর হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সরকারের এমন মনোভাবের কারণেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভারত জানিয়েছে, তারা হাসিনাকে ফেরত দেবে না। তিনি নিজে থেকে চাইলে দেশে ফিরতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে তার বিচার প্রক্রিয়া এবং ভারতের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক ভারত সফর করবেন। কিন্তু সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে ‘শেখ হাসিনা’ ইস্যু বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমনেও এমন ধারণা বদ্ধমূল যে, হাসিনা ভারতের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা ইস্যুটি একটি বড় অন্তরায় হলেও এটিই একমাত্র বাধা নয়। তিনি বলেন, সংকট নিরসনে উভয় পক্ষ থেকে কার্যকর আলোচনা বা কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাহস ও সদিচ্ছার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপ ছাড়া কূটনৈতিক জটিলতা কাটানোর অন্য কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় স্বার্থরক্ষায় দুই দেশের নেতৃত্বকে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার দায় হাসিনার ওপর বর্তায়। এছাড়া আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। সরকার চাইলেও হাসিনাকে বা নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটিকে রাজনীতির মাঠে আনা সম্ভব নয়, কারণ জনগণের বড় একটি অংশ এর বিরুদ্ধে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে থাকাটা কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার লক্ষণ। তিনি গঙ্গা পানিচুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে অগ্রগতির জন্য দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের আহ্বান জানান।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মনে করেন, বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে ডানপন্থার উত্থান ঘটছে, যা ভারতের বর্তমান সরকারের সমীকরণের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। তিনি বলেন, হাসিনা ভারতে না থাকলেও টানাপোড়েন চলত। গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে দুই দেশের উগ্রপন্থী বা দক্ষিণপন্থী অভিজাত শ্রেণির নেতিবাচক ভূমিকাই সম্পর্কের বড় অন্তরায়। এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে দুই দেশের মানুষের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতে চায়, অথচ সীমান্তের সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও বাণিজ্য প্রত্যাশা করে।