প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ পিএম। তাপের দহন, বন্যার ব্যাপক বিস্তার এবং সমুদ্রের ক্রমাগত আগ্রাসন—জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী অভিঘাতে এশিয়া মহাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। এই প্রেক্ষাপটে ভৌগোলিক অবস্থান, নিচু বদ্বীপভূমি, দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকা এবং বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশটিতে তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, কৃষির ক্ষতি, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাহীনতা এবং মানুষের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।
এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি বক্তব্য প্রদান করবেন। একই দিনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কেও বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও মূল্যায়নে বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাবের চিত্র ফুটে উঠেছে। তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা ও কৃষির ক্ষতিসহ প্রতিটি ঝুঁকি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ বর্তমানে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের প্রায় ১৮০ কোটি মানুষ অর্থাৎ ৮৯ শতাংশ মানুষ চরম তাপের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এছাড়া বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ মানুষ বন্যার সংস্পর্শে থাকলেও ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ ১৫ সেন্টিমিটারের বেশি গভীর বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু সংকট একক কোনো দুর্যোগ নয়; বরং নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি ও ঘনবসতির কারণে একই সঙ্গে একাধিক অভিঘাত মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের জলবায়ু ও উন্নয়নবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ভয়াবহ বন্যার ঘটনায় দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এদিকে আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার উপকূলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, যার সঙ্গে লবণাক্ততা যুক্ত হয়ে কৃষিজ উৎপাদন ও মিঠাপানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলছে।
কৃষি খাতও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। চরম আবহাওয়া ও লবণাক্ততার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি খাতের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি পানি নিরাপত্তার সংকটও ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসী হতে পারেন। কৃষি ও জীবিকা হারানো মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে পাড়ি জমালে ঢাকা ও অন্যান্য নগরের আবাসন, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।