মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা বাংলাদেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। দিল্লির লুটিয়েন্স জোনের সুরক্ষিত এলাকায় ভারতের আশ্রয়ে থাকা হাসিনার নির্দেশে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে ঢাকাসহ দেশব্যাপী বহুমুখী নাশকতার ছক কষা হচ্ছে। গত ২৪ ও ৩১ জুলাই দিল্লিতে হাসিনার বাসভবনে অনুষ্ঠিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই নাশকতার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
গোয়েন্দা ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, এই চক্রান্তে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের পেশাদার অপরাধী ও ভাড়াটে খুনিদের যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ভারতনিয়ন্ত্রিত ছদ্মবেশী জঙ্গি নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশকে (জেএমবি) মাঠে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আযমের ভাগ্নে নাবিল আহমেদ। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এই তরুণ জঙ্গি নেতা ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জামিনে বের হয়ে ভারতে পাড়ি জমান এবং গত তিন মাস ধরে দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থান করে অনলাইনে তরুণদের সংগঠিত করছেন।
গোয়েন্দারা এই অস্থিরতার পরিকল্পনাকে চারটি স্তরে চিহ্নিত করেছেন। প্রথম স্তরে রয়েছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের মাধ্যমে ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর। দ্বিতীয় স্তরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিলারদের ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং, তৃতীয় স্তরে উগ্রবাদী তরুণদের মাধ্যমে বোমা হামলা এবং চতুর্থ স্তরে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিক্ষক সংগঠনের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তর করার চেষ্টা।
দিল্লির বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সাবেক ফার্স্ট সেক্রেটারি রঞ্জন সেন এবং ঢাকার কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ মোট ২২ জন। প্রথম বৈঠকে ১২ জন এবং দ্বিতীয় বৈঠকে ১০ জন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশকে রাজধানীর অস্ত্রধারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও চাঁদাবাজির আড়ালে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা যায়। জুলাই বিপ্লবের নেতাদের টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
শিক্ষাঙ্গন ও পেশাজীবীদের আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার পরিকল্পনাও এই নাশকতার অংশ। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে পুঁজি করে শাহানা নামের এক বিতর্কিত শিক্ষক নেত্রীর মাধ্যমে রাজপথ অচল করার ছক তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষক ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরির দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাশকতার এই রক্তাক্ত নীলনকশা বাস্তবায়নে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে গাজীপুর সিটির সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং রাজধানীর গুলশানে বসবাসরত যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতার নাম এসেছে। মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার নির্দেশনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে ১১-১৩ আগস্ট জনসমাগমস্থলে ক্যাডার জড়ো করে ১৫ আগস্টে ধানমন্ডি ৩২ ও টুঙ্গিপাড়ায় বিশৃঙ্খলার দিকে মোড় নিতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশে সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ থানা ও পুলিশ লাইনসে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। পুলিশ, র্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো নাশকতার এই চক্রান্ত বানচাল করতে নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।