একসময় বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী ছিল চীন। পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে বেইজিং শত শত কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দিয়েছিল। তবে গত কয়েক বছরে সেই ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন বড় প্রকল্পে চীনের ঋণ প্রতিশ্রুতি কার্যত থেমে গেছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়েও এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কূটনৈতিক সূত্র, ব্যবসায়ী এবং বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, কোভিড-পরবর্তী চীনের অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ—সব মিলিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। ইআরডির তথ্যমতে, ১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশে ঋণ ও অনুদান হিসেবে ১ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় ৭৭২ কোটি ডলার। এর একটি বড় অংশ এসেছিল ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের পর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে।
শি জিনপিংয়ের সেই সফরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবে অবশ্য অল্প কয়েকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই ঋণচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ২০২১ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে প্রায় ১১৩ কোটি ডলারের ঋণচুক্তির পর থেকে চীন বড় কোনো নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ২০২৩ সালে রাজশাহী ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্পে প্রায় ২৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিই ছিল সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সহায়তা।
চীনের আগ্রহ হ্রাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা। শুরুতে বেইজিং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নিজ উদ্যোগে প্রস্তাব দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ প্রথম ধাপে ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছিল এবং চুক্তির খসড়া তৈরির পর্যায়েও পৌঁছেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আলোচনা থমকে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর ঘিরে আশা তৈরি হলেও তিস্তার অর্থায়ন নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি। ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, আগের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এবার আলোচনা হয়নি; বরং সম্ভাব্য সমীক্ষার কাজ দিয়ে প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুরু হচ্ছে, যার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থছাড়ে প্রশাসনিক ধীরগতিও চীনের আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগে ভাটা পড়ার পর বর্তমানে চীনের বড় বিনিয়োগের একটি অংশ আরসিইপি সদস্য দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংকট নিরসন এবং চীনে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ শোরুমের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, চীনা ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশেরও কম চীন থেকে এসেছে, যা জাপানের কাছাকাছি। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বে চীনা বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপের কারণেও তারা নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে ঋণের পরিমাণ কমলেও পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো, নদীশাসন, পদ্মা রেল সংযোগ ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে চীনা ঠিকাদারদের আধিপত্য এখনো বজায় রয়েছে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২৪০টি চীনা কোম্পানি কাজ করছে।
বেইজিং ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ছিল চীন। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগে ভাটা পড়ে। বর্তমানে চীনের বড় বিনিয়োগের একটি অংশ আরসিইপি সদস্য দেশগুলোয় চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে আরও সংযুক্ত হতে পারে, তাহলে বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু এফটিএ নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংকটও বড় বাধা। কুমিল্লা ইপিজেডে প্লট নেওয়া কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। এছাড়া বাংলাদেশে একটি চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, চীনে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ শোরুম এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।