চট্টগ্রামে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টিতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও সাতটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশে। কাগজে-কলমে লোডশেডিং না থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে নগর ও গ্রামে চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তাদের কাগজে-কলমে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ শূন্য মেগাওয়াট দেখালেও বাস্তবে চট্টগ্রামে ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। পিডিবির মঙ্গলবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ উভয়ই সমান—১ হাজার ৬৮ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট। অফ পিক আওয়ারেও চাহিদা ও সরবরাহ সমপরিমাণ ৯৫৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট দেখানো হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। যেমন, বুধবার কল্পলোক আবাসিক এলাকায় ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে।
তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলছে না। এতে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জেনারেটর চালিয়েও এই সংকট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
পিডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে—হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাপ্তাই সোলার (৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট), রাউজান-১ ও রাউজান-২ (দুটি ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র), টেকনাফ সোলার (২০ মেগাওয়াট) এবং ইউনাইটেড পাওয়ার (৫০ মেগাওয়াট)। এছাড়া উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসা সাতটি কেন্দ্র হলো—আনলিমা এনার্জি লিমিটেড (১১৬ মেগাওয়াট), আনোয়ারা ইউনাইটেড (৩০০ মেগাওয়াট), বারাকা (৫০ মেগাওয়াট), বারাকা কর্ণফুলী, জুডিয়াক (৫৪ মেগাওয়াট), এবং জুলদা-১ ও জুলদা-২ বিদ্যুৎকেন্দ্র। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে আরও কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গত সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন। দৈনিক প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদা থাকলেও তা না পাওয়ায় গত ৪ মার্চ থেকে সার কারখানাটি অচল হয়ে পড়ে। এর আগে সর্বশেষ ৩ মার্চ কারখানাটিতে উৎপাদন হয়েছিল। দীর্ঘ এই অচলাবস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে, পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সিইউএফএল-এর এক হাজারের বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী।
সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ৪ মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে এবং তখন কারখানাটি সচল করা সম্ভব হতে পারে।
ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। এ অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে এবং সাতটি বন্ধ হওয়ার পথে। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। বাকি ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে থাকলেও চট্টগ্রামে লোডশেডিং চরমে পৌঁছেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি না মেলায় সংকটে পড়েছেন নগরবাসী। তাছাড়া চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।