১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে সংখ্যাগত দিক থেকে জনশক্তি বাড়লেও দক্ষ জনবলের অভাব এখন দেশের প্রতিটি খাতের জন্য একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, বেসরকারি খাত কিংবা শিক্ষা—সবখানেই এই দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। রাজনীতিতে স্লোগানদাতা অনেক থাকলেও প্রতিশ্রুতিশীল ও দেশপ্রেমিক নীতিনির্ধারকের অভাব প্রকট। অর্থনীতিতে হিসাবরক্ষক প্রচুর, কিন্তু উদ্ভাবকের দেখা মেলা ভার। পুলিশের পদগুলো পূর্ণ থাকলেও অপরাধ তদন্ত ও পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চেয়ে রাজনৈতিক দলের পেছনে ছুটছেন। গণমাধ্যমে সাংবাদিকের অভাব না থাকলেও নির্মোহ পেশাদারত্ব ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার লোক কমছে। বেসরকারি খাতে কারখানা থাকলেও ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দক্ষতার অভাব বর্তমানে জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন তারা। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। দ্বিতীয়ত, সমাজে যোগ্যতার চেয়ে তদবির এবং সততার চেয়ে সংযোগ বা পেছনের দরজাকে গুরুত্ব দেওয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেধা পাচার। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া মেধাবীরা দেশে উপযুক্ত চাকরির অভাবে আর ফিরছেন না। এছাড়া কিছু দক্ষ লোক থাকলেও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের ভিড়ে তাদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, দক্ষতা কেবল সার্টিফিকেটের বিষয় নয়; এটি তাত্ত্বিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও শিক্ষার মান বাড়েনি। দক্ষতা বাড়াতে তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি: শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষতাকে লালন করা এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক সংকীর্ণতা দূর করা। তিনি উদাহরণ দেন যে, বিশ্বখ্যাত স্থপতি এফআর খান স্বাধীনতার পর দেশে সেবা দিতে চাইলেও বুয়েট তাকে আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করেনি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, মানুষ জন্মগতভাবে দক্ষ হয় না; শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থাই তাকে দক্ষ করে গড়ে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থা অনুপস্থিত। একই অভিমত ব্যক্ত করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান। তিনি বলেন, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপ দিতে সততাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল প্রয়োজন। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় কথা বলায় পিছিয়ে থাকা তরুণদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নার্সিং ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরিসংখ্যান বলছে, এই সংকট কতটা গভীর। বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার, যা এক দশক আগের চেয়ে প্রায় আটগুণ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম। এছাড়া সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের কৌশলপত্র অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে (এনইইটি) রয়েছে। বিবিএস-এর তথ্যমতে, দেশের সামগ্রিক এনইইটি হার প্রায় ৪১ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব গড় ২২ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও ভয়াবহ, প্রায় ৬২ শতাংশ।
দক্ষতার অভাবের কারণে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের মতো অনেক খাতে উচ্চপদে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যেও দক্ষ জনশক্তির হার মাত্র ২৩ দশমিক ৫০ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে স্বল্প বা অদক্ষ কর্মীর হার ৫৪ শতাংশের বেশি। ফলে জনশক্তি রপ্তানি থেকে প্রত্যাশিত রেমিট্যান্স আয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগ্যতার পরিবর্তে যখন তদবির বা রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়া যায়, তখন মেধাবী তরুণরাও নীতি-নৈতিকতার পথ ছেড়ে শর্টকাট পথ খোঁজেন। এই পরিস্থিতি উত্তরণে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ বৃদ্ধি এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।