গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তহবিলের অভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোদমে উৎপাদন চালাতে পারছে না, যার ফলে শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পিডিবি আগামী এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কাছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
শনিবার সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে গ্যাসের ওপর চাপ কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ পিডিবিকে পিক আওয়ারে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে শিল্প খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সংকটকালীন সময়ে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ থাকলেও তা কমিয়ে ৮৫ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। তবে বাস্তবে বিদ্যুৎ খাতে এখনো প্রায় ৮৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে শিল্প, বাসাবাড়ি এবং সিএনজি পাম্পে গ্যাসের সংকট কাটছে না।
পিডিবি জানিয়েছে, রাতারাতি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয় কারণ কেন্দ্রগুলোতে তেলের মজুত প্রায় শেষ। বর্তমানে প্রায় ৩০টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৮৫ হাজার ৮৫০ টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে বিপিসি জানিয়েছে, পিডিবি চলতি বছরের জন্য ৭৫ হাজার টনের চাহিদা দিলেও ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টন সরবরাহ করা হয়েছে এবং বর্তমানে মজুত আছে মাত্র ৩৩ হাজার টন। তবুও বিদ্যুৎ খাতের জন্য চলতি বছরে আরও ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
২৩ আগস্ট বিদ্যুৎ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে পিডিবি উল্লেখ করেছে, ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন, যার মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পিডিবি বর্তমানে দেনার দায়ে জর্জরিত এবং তাদের কাছে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪৬ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) জানিয়েছে, বেসরকারি ৫৩টি কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে বকেয়া বিলের কারণে অনেক কোম্পানি খেলাপি হয়ে পড়ায় তেল আমদানি করতে পারছে না।
বর্তমানে সরকার ৪ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা দিলেও পিডিবি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারছে। ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য পিডিবির ৬টি কেন্দ্রে ১২ হাজার ৮৫০ টন এবং বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্রে চাহিদামত তেল প্রয়োজন। মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় দেশে ১৬ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৩ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে এবং ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। জ্বালানি বিভাগ বলছে, ১ সেপ্টেম্বরের আগে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে তেলের সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসের ওপর নির্ভরতাও কমানো যাচ্ছে না। তাই ১ সেপ্টেম্বরের আগে শিল্প খাতে আগের মতো গ্যাস দেওয়া যাবে না। মঙ্গলবার সারা দেশে গ্যাস দেওয়া হয়েছে গড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৮৮ কোটি, সার খাতে ১৭ কোটি, বাকি গ্যাস দেওয়া হয় বাসাবাড়ি, চা বাগান, শিল্প, সিএনজি রিফুয়েলিংসহ অন্যান্য গ্রাহক খাতে। এছাড়া আজ থেকে চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা চালু হওয়ায় গ্যাসের চাহিদাও বাড়বে, তবে সেপ্টেম্বরে কাফকো কারখানা মেরামতের জন্য বন্ধ হলে গ্যাস পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে ২৩ আগস্ট বিদ্যুৎ সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পিডিবি বলেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এজন্য এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হবে। প্রতি লিটার ১০০ টাকা হিসাবে এই তেল কিনতে পিডিবির দরকার হবে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তেল কেনার জন্য এই অর্থ অগ্রিম হিসাবে না দিলে তেল পাওয়া যাবে না। যদিও পিডিবি দেনায় জর্জরিত। এই সংস্থার কাছে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দরকার বলে জানায় পিডিবি।
বিপ্পার সভাপতি ডেভিট হাসনাত যুগান্তরকে বলেন, বেসরকারি সব কেন্দ্র দেশের এ সময়ে পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো বকেয়া বিল। বিপ্পার সদস্যদের প্রায় ৭-৮ হাজার কোটি টাকা পাওনা আছে। দীর্ঘদিন বিল বাকি থাকায় অনেক কোম্পানি ব্যাংকের কাছে খেলাপি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এখন সরকার এই বকেয়া দিয়ে দিলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজ থেকে তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।