একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজের প্রধান শর্ত হলো নারীর অবাধ ও নিরাপদ বিচরণ। অথচ বর্তমান সমাজব্যবস্থায় গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র, সাইবারজগৎ এমনকি গৃহকোণেও নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই শঙ্কা ও ভয়ের পরিবেশ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আমানুর রহমানের সমন্বয়ে কয়েকজন সচেতন শিক্ষার্থী তাদের সুচিন্তিত ভাবনা তুলে ধরেছেন।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, নারী কেবল সমাজের অর্ধেক নয়, সভ্যতার ভিত্তি। তিনি উল্লেখ করেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো’ (সূরা আন-নিসা: ১৯)। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জাতীয় অগ্রগতির পূর্বশর্ত। তিনি আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী রেশমী আকতারের মতে, নারীদের নিরাপত্তা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির শিকলে বন্দি। কর্মক্ষেত্রে কটূক্তি ও নোংরা প্রস্তাবের শিকার হওয়া নারীদের জন্য একা পথ চলা আজ আতঙ্কের নাম। তিনি বলেন, নারীদের কেবল ভোগের বস্তু না ভেবে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা তৈরি না হলে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি অসম্ভব।
বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিমা আক্তার গণপরিবহনে হয়রানি রোধে সুনির্দিষ্ট সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মতো প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলেছেন। তবে তিনি মনে করেন, কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনই স্থায়ী সমাধান আনতে পারে।
অনলাইন জগতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম কলেজের তানজিলা আক্তার। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসে ২,৬৯৪টি অভিযোগের মধ্যে ৩১ শতাংশ ট্রলিং, ১৭ শতাংশ হ্যাকিং এবং ১৫ শতাংশ অন্যের পরিচয় ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও জানান, অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী, ১৪ শতাংশ কিশোরী এবং ২৪ শতাংশ কর্মজীবী। তিনি ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন।
নিউ গভর্মেন্ট ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী শ্যামা মেহজাবিন রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেন, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ৭০ শতাংশ নারী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যের হাতেই সহিংসতার শিকার হন। অথচ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই স্বাধীন দেশে নারী আসলে কার কাছে নিরাপদ?
চট্টগ্রাম কলেজের অস্তি বড়ুয়া মনে করেন, দেশে আইন থাকলেও অর্থের আধিপত্য ও বিচারহীনতার কারণে ন্যায়বিচার থমকে যাচ্ছে। তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংবিধানের লিখিত দলিল যেন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তব জীবনে আইনের স্বচ্ছ ও সুচারু প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল নারীদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।