প্রতিদিনের জীবনে অন্যতম কষ্টদায়ক এক শারীরিক সমস্যা হলো গোড়ালি ব্যথা। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঝেতে প্রথম পা ফেলার সময় তীব্র সুই ফোটার মতো অনুভূতি কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ হাঁটতে গেলে গোড়ালি কামড়ে ধরা— এমন সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে সাধারণত ‘প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়াটিস’ বা গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়া বলা হয়। দীর্ঘদিনের এই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে আগে ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড ইনজেকশনই ছিল প্রধান অবলম্বন, যার নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে আধুনিক চিকিৎসায় কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার বা ওষুধ ছাড়াই এই সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব, যা ‘এক্সট্রাকোর্পোরাল শকওয়েভ থেরাপি’ বা সংক্ষেপে ‘শকওয়েভ থেরাপি’ নামে পরিচিত।
নাম শুনে বৈদ্যুতিক শক মনে হলেও এটি আসলে কোনো ইলেকট্রিক শক নয়। এটি মূলত একটি অত্যাধুনিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শাব্দিক তরঙ্গ (অ্যাকোস্টিক ওয়েভ) ব্যথার সুনির্দিষ্ট স্থানে বা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুতে প্রয়োগ করা হয়। গোড়ালির নিচের শক্ত পর্দা বা টিস্যুতে অতিরিক্ত চাপ বা ফাটলের কারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হলে এই থেরাপি মূলত তিনটি উপায়ে কাজ করে। প্রথমত, শাব্দিক তরঙ্গের মাধ্যমে ব্যথার স্থানে নতুন রক্তনালি তৈরিতে উদ্দীপনা জোগায়, যা সেখানে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে সক্রিয় করে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু দ্রুত মেরামত করতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়ার কারণে যে ক্যালসিয়ামের শক্ত আস্তরণ তৈরি হয়, শকওয়েভ তা ভেঙে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এই আধুনিক থেরাপির বড় সুবিধা হলো, এতে কোনো প্রকার কাটাছেঁড়া বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে সহজেই বেঁচে থাকা যায়। এটি সম্পূর্ণ ওপিডিভিত্তিক চিকিৎসা, অর্থাৎ থেরাপি নেওয়ার পর রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না, সরাসরি বাড়ি চলে যাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদি গোড়ালি ব্যথার ক্ষেত্রে এই থেরাপির সাফল্যের হার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। এছাড়া থেরাপি দেওয়ার সময় কোনো অবশকারী ইনজেকশন বা অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রোগীর ব্যথার তীব্রতা ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ থেকে ৫টি সেশনের প্রয়োজন হয়। প্রতি সেশনে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে এবং সাধারণত সপ্তাহে একবার করে এই থেরাপি দেওয়া হয়ে থাকে।
যারা দীর্ঘদিন গোড়ালি ব্যথায় ভুগছেন এবং ওষুধ, গরম পানির সেঁক কিংবা সাধারণ ফিজিওথেরাপিতে সুফল পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে ক্রীড়াবিদ, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ এবং যাদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা দারুণ কাজ করে। তবে শকওয়েভ থেরাপি অত্যন্ত নিরাপদ হলেও গর্ভবতী নারী, শরীরে পেসমেকার লাগানো রোগী, তীব্র রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা বা ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা যাবে না। তাই থেরাপি নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। গোড়ালি ব্যথাকে অবহেলা করলে তা পরবর্তীতে কোমর বা হাঁটু ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই ব্যথানাশক খেয়ে লিভার বা কিডনি ঝুঁকিতে না ফেলে সঠিক সময়ে শকওয়েভ থেরাপির পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে একটি সচল ও ব্যথামুক্ত জীবন উপভোগ করা সম্ভব।