রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ থেকে মুহূর্তের উত্তেজনায় বাড়ছে হত্যাকাণ্ড। ধারালো অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার মাধ্যমে এসব নৃশংস ঘটনায় পরিবার ও সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। অপরাধ গবেষকরা মনে করেন, অপরাধীদের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে সহিষ্ণুতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ দিনেই একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে বড় ভাইয়ের হাঁসুয়ার কোপে ছোট ভাই ইমদাদুল হক বাদাল নিহত হন। একই দিনে কুমিল্লার মুরাদনগরে জমি নিয়ে বিরোধে বোন খালেদা আক্তার ও ভাতিজা মনজুরুল আলম টিটুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ১৩ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে পারিবারিক কলহের জেরে মিম আক্তার নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্বামী তারিক শিকদারের বিরুদ্ধে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসে সবচেয়ে বেশি ৩২৬টি এবং মার্চে ৩১৭টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৭৭৮টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১২.২ শতাংশ বা ১৯৩টি বেশি। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৪১১টি ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩টি মামলা হয়েছে, যা মোট মামলার প্রায় ৪৪ শতাংশ।
মার্চ ও এপ্রিল মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দুই মাসে নথিভুক্ত ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩৩৬টি ছিল পূর্বশত্রুতাজনিত, ১৪৬টি পারিবারিক বিরোধ, ৬৯টি সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধ, ১৯টি আকস্মিক হামলা, ৯টি আধিপত্য বিস্তার, ৬টি ডাকাতি এবং ৫টি প্রেম বা পরকীয়া সংক্রান্ত। এছাড়া ৩টি হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক।
সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকেও একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সবুজবাগে প্রেম সংক্রান্ত বিরোধে সিফাত উল্লাহ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে মারধর ফেরাতে গিয়ে আলতাফ হোসেন নামে এক এসআই পিটিয়ে হত্যার শিকার হন। ৪ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে শাকিল নামে এক যুবক পারিবারিক বিরোধে বাবা আব্দুল বাছেদ মিয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। ১ সেপ্টেম্বর নড়াইলে টিউবওয়েলের পানি পড়া নিয়ে বিরোধে সাইফুল বিশ্বাস নামের এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে বগুড়ায় চোর সন্দেহে শামীম হোসেন নামে এক যুবককে পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় এবং বরগুনার পাথরঘাটায় পারিবারিক বিরোধে পিয়ারা বেগম খুন হন। এছাড়াও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বিয়ে সংক্রান্ত কথা কাটাকাটির জেরে আবদুল মান্নান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে লুডু খেলা নিয়ে রফিক মিয়া এবং চট্টগ্রামের রাউজানে মোটরসাইকেল চুরির সন্দেহে করিম নামে এক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং সামাজিক সহিষ্ণুতা কমে যাওয়াই এসব সহিংসতার মূল কারণ। অপরাধী পার পেয়ে যায় এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগকে আরও তৎপর হতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে প্রায় ২৯৬টি এবং দিনে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে। হিসাবে দেখা গেছে, জুন মাসে সবচেয়ে বেশি ৩২৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। এরপর মার্চে ৩১৭ এবং মে মাসে ৩১০টি। সবচেয়ে কম ছিল ফেব্রুয়ারিতে, ২৫০টি। প্রথম ৬ মাসের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ১৯৩টি বেশি। হিসাবে প্রায় ১২.২ শতাংশ হত্যা মামলা বেড়েছে।
চলতি বছরের শুরুর ৬ মাসের অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৪১১টি হত্যা মামলা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩, রাজশাহীতে ১৮৩, খুলনায় ১৭৩, রংপুরে ১১০, সিলেটে ১০৮, ময়মনসিংহে ১০৫ এবং বরিশালে ৯৬টি। অর্থাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেই মোট মামলার প্রায় ৪৪ শতাংশ।