বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান ব্যাংকিং ঝুঁকি, বিনিয়োগ মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান এই সংকটময় পরিস্থিতিকে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি সরকারকে এ সংকটের ভয়াবহতা প্রকাশ্যে স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এখনই কার্যকর ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ খরা, স্থবির প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্রে আটকে থাকতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। আইএমএফের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের ৬ শতাংশের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি। ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৮ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ২২ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতির সম্ভাবনা রয়েছে; আইএমএফের ধারণা অনুযায়ী, দশকের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয় জিডিপির ৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে এবং সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় ২০৩১ সাল নাগাদ মোট রাজস্বের ৪০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
জ্যোতি রহমানের মতে, এই সংকটের পেছনে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত দায়ী নয়, বরং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতা মূল বাধা। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা ঋণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি করছে, যার ফলে বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল মুদ্রানীতি শিথিল করে বা সাময়িক ঋণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
প্রস্তাবিত সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সতর্ক রাজস্বনীতি গ্রহণ, ভর্তুকি সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংস্কার কার্যক্রম সফল হলেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাই সরকারের উচিত ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত ক্ষতির হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং ব্যয়সংকোচন বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা।
আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্বব্যাংকও ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। সংস্থাগুলোর ধারণা, আগামী দশকেও বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।