নেপাল থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সস্তা জলবিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেই বিদ্যুৎ আমদানির স্বার্থে একটি যৌথ আঞ্চলিক সঞ্চালন লাইন (গ্রিড) গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ সচিবদের ১৯তম সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর এলাকা দিয়ে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৭৬৫ কেভির হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন চায় দিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই গ্রিড চালু হলে বাংলাদেশও প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ নিতে পারবে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একক কোনো সঞ্চালন লাইন তৈরির অনুমতি না দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে ঢাকা। সমান সুযোগ ও সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক গ্রিড কাঠামোর নিশ্চেয়তা ছাড়া ভারত এককভাবে এই সুবিধা পাবে না বলে বৈঠকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নীতিনির্ধারক জানান, বাংলাদেশ কোনো দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা না চেয়ে ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ কিংবা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ সমন্বয়ে একটি সুসংহত আঞ্চলিক গ্রিড দেখতে চায়। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বা আঞ্চলিক সংযোগ থাকা প্রয়োজন বলে ঢাকা মনে করে। এই আঞ্চলিক গ্রিড ধারণার প্রতি সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য দেশও সমর্থন প্রকাশ করেছে। সম্মেলনের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। আগামী বছর বিদ্যুৎ সচিবদের পরবর্তী আঞ্চলিক সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নেপাল বাংলাদেশকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও শীতকালে তা কমে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামে, ফলে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে। অন্যদিকে শীত বা শুষ্ক মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পায়। এ বাস্তবতায় শীতে নেপালে বিদ্যুৎ রপ্তানি করার বিষয় নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে নেপাল থেকে দৈনিক ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ, যার প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে মাত্র ৮ টাকা ১৭ পয়সা। বিপরীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট ১৩ টাকারও বেশি খরচে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির পরিচালক অমসু কিরণ শাহী গত ২৬ অক্টোবর এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানান, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি প্রক্রিয়া নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সচিবদের সঙ্গে একটি সফল ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বিনিময়ের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ায় পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। এই অবিশ্বাসের পরিবেশ দূর না হলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের বিপুল সস্তা জলবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুফল অঞ্চলে পৌঁছাবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে গত ১৯-২০ জুলাই অনুষ্ঠিত দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের যৌথ কার্যকরী কমিটির (জেডব্লিউজি) বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাবটি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে তৎকালীন সরকারও এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে যেতে পারেনি।
পরবর্তীতে গত ৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের প্রসঙ্গটি পুনরায় উত্থাপন করেন। ওই সাক্ষাতের পর মন্ত্রী জানান, ভারতের প্রস্তাবিত মডেলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে সঞ্চালন লাইন নেওয়ার পরিকল্পনা ঢাকার ভাবনায় নেই।
৯-১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে বিদ্যুৎ সচিবদের ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে এতে মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে ভারত তাদের সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পার্বতীপুর দিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার করিডর ব্যবহারের অনুমতি চায়। ভারত জানায়, এই লাইন দিয়ে বাংলাদেশও চাইলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।