স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর অতিরিক্ত সময় দিয়েছে জাতিসংঘ। এতে আপাতত সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো থেকেই যাচ্ছে। আগামী ২০২৯ সালে চূড়ান্ত উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমানো, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা, নতুন বাজার সৃষ্টি, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানো, ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২০২৯ মেয়াদে পাঁচ স্তম্ভের একটি জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে ৩৮টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে এফটিএ, পিটিএ ও সেপা সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণে সরকার যে পাঁচটি রূপান্তরমূলক স্তম্ভের ওপর জোর দিয়েছে, সেগুলা হলো—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও মার্কেট অ্যাকসেস’ নথির তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনে জাতিসংঘ সাড়াদানে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। সরকার মসৃণ উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অংশ হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (এমঅ্যান্ডই) কাঠামো চূড়ান্ত করেছে। এই কাঠামোর আওতায় ‘মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণের জাতীয় রোডম্যাপ (২০২৬-২০২৯)’ রূপায়ণ করা হচ্ছে। বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রস্তুতির নেতৃত্ব দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, যার মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা), জাতীয় মান কাঠামোর (এনকিউআই) উন্নয়ন, ভ্যালু চেইনের আধুনিকায়ন এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত মেধাস্বত্ব অধিকার (ট্রিপস) চুক্তির ক্রান্তিকালীন নমনীয়তা রক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের সভাপতিত্বে ‘জাতীয় এলডিসি পরিবীক্ষণ ও সমন্বয় কমিটি’ এবং ইআরডি সচিবের সভাপতিত্বে ‘এলডিসি উত্তরণবিষয়ক সরকারি-বেসরকারি টাস্কফোর্স’ সক্রিয় করা হয়েছে। পরিচালনগত পরিবীক্ষণ ইউনিট হিসেবে কাজ করছে ইআরডির অধীন ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)’, যা নিয়মিত ‘ত্রৈমাসিক উত্তরণ প্রস্তুতি ড্যাশবোর্ড’ প্রকাশ করছে। সংসদীয় কমিটির নথি অনুযায়ী, উত্তরণের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাবটি গত ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির (ইউএন-সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠায় সরকার। সরকার এই বাড়তি সময়কে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়া হিসেবে না দেখে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বাড়তি সময় চাওয়ার মূল উদ্দেশ্য উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করা। এই লক্ষ্যে জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সহজে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি বলেন, করোনা মহামারি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছিল, যার কারণে বেসরকারি খাতও সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় এই ৩ বছর সময় পাওয়া গেছে, যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
এলডিসি সুবিধা কমে যাওয়ার পর সম্ভাব্য শুল্কঝুঁকি সামলাতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে জোর দিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে ৩৮টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী কানাডা, মরিশাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনার অনুমোদন দিয়েছেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপক্ষীয় ইপিএ এবং বর্তমানে তা অনুসমর্থন পর্যায়ে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সেপা আলোচনার কারিগরি পর্যায় গত ৪ আগস্ট শেষ হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সেপার দ্বিতীয় দফা এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার দুই দফা সম্পন্ন হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে এবং নিউজিল্যান্ড ও তুরস্কের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আরসিইপি চুক্তিতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ কার্যকর রয়েছে, যার অধীনে বাংলাদেশের ১০০টি পণ্য ভুটানে এবং ভুটানের ৩৪টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া এপিটিএ, ডি-৮ পিটিএ, টিপিএস-ওআইসি ও সাফটার সুবিধা ব্যবহারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে জাতীয় রোডম্যাপে ওষুধ, কৃত্রিম তন্তু, পোশাকের সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি ও আইটি-সেবা, কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, হালাল খাদ্য, পাট, চামড়া, পুনর্ব্যবহৃত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং সেমিকন্ডাক্টর—এই ১৩টি খাতকে রপ্তানি বহুমুখীকরণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের মধ্যে মোট রপ্তানিতে পোশাকবহির্ভূত পণ্যের অংশ ২৫ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য পূরণে বৈদেশিক বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা পর্যবেক্ষণ করবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো। এছাড়া বিনিয়োগ পরিবেশ ত্বরান্বিত করতে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর অধীন বিনিয়োগ বোর্ড, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিডা ও হাইটেক পার্ক সংক্রান্ত সেবা একক কর্তৃপক্ষের অধীনে এনে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখা আরেকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধা এবং যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস)-এর অধীনে উত্তরণ-পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের বাজারেও বর্তমান সুবিধা বজায় রাখার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা মিলেছে। তবে চূড়ান্ত উত্তরণ ২০২৯ সাল নির্ধারণ করায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও নিয়মের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এসব সুবিধা হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, সময় তিন বছর পিছিয়ে পাওয়া বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর একটি বড় সাফল্য। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে অর্থনীতিতে স্বস্তি এলেও নিছক সময় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। তিনি বিগত সরকারের সময়ের অর্থনৈতিক ক্ষতির সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। উত্তরণ-পরবর্তী বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান মত প্রকাশ করেন যে, বাড়তি সময়কে শিথিলতা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবা খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রসারে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।