রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে ‘মব’ বা অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রামেবির অস্থায়ী কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য নিজে এই অভিযোগ তুলে ধরেন এবং জানান, ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কক্ষে ঢুকে জোর করে একটি কাগজে তাঁর সই আদায় করে। লাঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি ওই কাগজে সই করতে বাধ্য হন, যা মূলত একটি পদত্যাগপত্র ছিল বলে তাঁর ধারণা।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক জাওয়াদুল হক জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ের বাইরে স্লোগানের শব্দ শুনতে পান তিনি। এর কিছুক্ষণ পরই পিয়নদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কক্ষে ঢুকে পড়ে। তারা তাঁকে চেয়ার থেকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে রাজশাহীর স্থানীয়দের কাজ না দিয়ে ঢাকার বাসিন্দাদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ তোলে।
এরপর হামলাকারীদের একজন তাঁর সামনে একটি ছাপানো কাগজ মেলে ধরে। উপাচার্য কাগজটি পড়তে চাইলে তাঁকে ধমক দিয়ে বলা হয়, ‘পড়ার দরকার নেই, সই করতে হবে।’ এ সময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। উপাচার্য বলেন, সই না করলে তিনিও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন—এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি সই করতে বাধ্য হন। কাগজটির ওপরে ‘পদত্যাগপত্র’ জাতীয় একটি শব্দ তাঁর চোখে পড়েছিল, তবে পুরো কাগজটি তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি।
সই নেওয়ার পর ওই দলটি উপাচার্যকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয়। প্রথমে তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হয় এবং একজন মোটরসাইকেলে করে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর রামেবির বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং কার্যালয়ের কম্পিউটার সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়। উপাচার্য অভিযোগ করেন, তাঁর অফিসের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নেওয়া হয়েছে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে registrar, ডেপুটি registrar ও সহকারী registrar সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলছে। তালা ভাঙার চেষ্টা করলে হাত ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন উপাচার্য। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই পরিস্থিতির সমাধান না হলে চলমান পরীক্ষা এবং একাডেমিক, প্রশাসনিক ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এর আগে ‘রাজশাহী আপামর ছাত্রজনতা’র ব্যানারে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও রামেবি কর্মকর্তাদের মতে, উপাচার্যের কার্যালয়ে হানা দেওয়া দলটিতে রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরফুদ্দিন শামীমসহ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তবে জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শরফুদ্দিন শামীম। তাঁর দাবি, উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পছন্দের লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে তাঁরা কেবল মানববন্ধন করেছিলেন, জোরপূর্বক পদত্যাগের কোনো নেতৃত্বে তিনি ছিলেন না। উপাচার্য অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর উপাচার্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। কার্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতি ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। রামেবি registrar দপ্তর থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এদিকে উপাচার্যের পিএস মো. নাজমুল হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি বা ভিসি স্যার কেউই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি, তাঁদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।